উপস্থাপক: আপনার জীবনে ধর্ম কোনো ভূমিকা রাখে? যদি রাখে, তাহলে আপনি ধর্মকে কীভাবে দেখেন?
মার্ক জাকারবার্গ: আসলে আমি বলব, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্ম আমার জীবনে ক্রমবর্ধমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমি ইহুদি পরিবারে বড় হয়েছি। আমার মনে হয়, কলেজে যাওয়ার সময়ে হয়ত আমি ধর্ম নিয়ে ততটা মনোযোগী ছিলাম না।
গত পাঁচ-ছয় বছরে কিছু ঘটনা আমাকে ধর্ম নিয়ে একটু বেশি মনোযোগী করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হলো আমার পরিবার আর বাচ্চা হওয়া। বাচ্চা হবার পরে আমার মনে হয়, বাচ্চাদের জন্য কিছু ভালো রীতি থাকা দরকার। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন কিছু কাজ করতাম যেগুলো আমার কাছে অনেক অর্থপূর্ণ ছিল। যেগুলো ভালো, সেগুলো রাখতে চাই, আর যেগুলো ভালো না, সেগুলো বাদ দেই। আমি বুঝেছি— বাচ্চাদের জন্যে কিছু মূল্যবোধ থাকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমরা আমাদের মেয়েদের ইহুদি হিসেবে বড় করছি, আর এটা আমাদের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে গেছে।
প্রায় প্রতিটি শুক্রবার, যা-ই ঘটুক না কেন, আমরা শাবাত ডিনার করি। প্রিসিলা এটা খুব ভালোবাসে। এটা ওর কাছে প্রায় ধ্যান করার মতো একটা বিষয়। মঙ্গলবার বা বুধবার থেকেই সে এক ঘণ্টা করে সময় বের করে শাবাত ডিনারের রান্না শুরু করে। আমরা তখন অনেক বন্ধুদের বাসায় নিয়ে আসি, এটা আমাদের সপ্তাহের একটা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
শাবাত ডিনার আমার জন্য এবং সম্ভবত অনেক মানুষের জন্য একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বলা চলে। (তবে এর অন্য প্রভাবও আমি পেয়েছি।) ব্যক্তিগতভাবে আমার এবং সম্ভবত পুরো বিশ্বের জন্য শেষ পাঁচ ছয় বছর অনেক কঠিন কেটেছে।
যদি আপনি দেখেন আমাদের কোম্পানি সম্পর্কে মানুষ কী ভাবত ২০১৬ সালের আগে, তাহলে দেখবেন—প্রায় প্রত্যেক মাসেই মানুষ আমাদের সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলতো। আর ২০১৬ সালের পর থেকে প্রায় প্রত্যেক মাসেই মানুষ আমাদের সম্পর্কে ইতিবাচক কথা বলে।
এখন আমার একটা উপলব্ধি হচ্ছে—জীবনে এমন কিছু থাকা দরকার যা আপনার চেয়ে বড়।
যদিও আমাদের দেশে অনেক সমস্যা আছে, আমি এখন গণতন্ত্রে আগের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করি। আগে হয়ত আমি বিষয়টা এত গভীরভাবে ভাবিনি। কিন্তু এখন আমি মনে করি, গণতন্ত্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশ্বাস করা একটা বড় শক্তি, যা যেকোনো ব্যক্তির চেয়ে বড়। এটা একটা ভিত্তি দেয়।
একইভাবে, আমি মনে করি—এমন কিছুর উপর বিশ্বাস রাখা উচিত, যা তারও চেয়ে বড়—যেমন ঈশ্বর—এটাও আমাকে অনেক বেশি ভরসার জায়গা দেয়।
যত বেশি আপনি বাইবেল বা তোরাহ পড়বেন, আপনি তত বেশি বুঝতে পারেন যে এর মধ্যে জীবনের জন্য কত জ্ঞান রয়েছে। আপনি জানবেন, কীভাবে জীবন যাপন করা উচিত, সৃষ্টি আর নির্মাণ নিয়ে কিভাবে চিন্তা করা উচিত।
আপনি যা-ই করুন না কেন, সেটা যতই আধুনিক বা প্রযুক্তিনির্ভর হোক না কেন—এই সব প্রাচীন গ্রন্থে কিছু শিক্ষণীয় বিষয় থাকে, যেগুলো গভীরভাবে অর্থবহ।
আমার কাছে তোরাহর শুরুটাই খুব অর্থবহ। বেশিরভাগ বাইবেলই মানুষের জীবনের নিয়মকানুন নিয়ে। কিন্তু এটা শুরু হয় সৃষ্টির কাহিনী দিয়ে। প্রশ্ন জাগে—কেন এটা শুরুই হয় এই জায়গা থেকে?
এর শুরুটা হলো—ঈশ্বর মানুষকে নিজের প্রতিচ্ছবিতে সৃষ্টি করেছেন। এই কথার মানে কী? এর মানে কি আমরা কিছু একটা করতে বাধ্য?
এখানে আমার একটা ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা আছে—আমাদের জীবনের বড় উদ্দেশ্য হলো এই জগতে ভালো কিছু সৃষ্টি করা। এটা আমাদের ভেতরে গভীরভাবে নিহিত।
যখন আমার খারাপ দিন যায় বা খারাপ মাস যায়, তখন আমি এটা নিয়ে ভাবি না। আমাদের দায়িত্ব হলো ভালো কিছু নির্মাণ করা, যা এই পৃথিবীকে আরও ভালো করে তুলবে। আমি মনে করি এটা আমাদের কাজের একটা মৌলিক ভিত্তি।
যখন মানুষ জীবনে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়, তখন এ ধরনের বিশ্বাস আপনাকে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে সাহায্য করে এবং আপনাকে দীর্ঘ ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত রাখে।
এটা আমার জীবনেও সত্যি হয়েছে।
আমি আসলে এখানে অস্টিনে আমার কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে একাধিক শাবাত ডিনারে গিয়েছি, আর তাতে আমি উপলব্ধি করেছি—আমার জীবনে সম্ভবত কিছু রীতি-নীতির অভাব আছে। এটা একটা আশ্চর্যজনকভাবে স্থিতিদায়ক ও ভালো রীতি। এমনকি ধর্মীয় প্রেক্ষাপট ছাড়াও।
আমি এখন বইটার নাম মনে করতে পারছি না, মনে হয় Four Thousand Weeks, লেখক অলিভার বার্কম্যান। সেখানে একটা অধ্যায় আছে যার নাম Cosmic Insignificance Therapy—যেখানে বলা হয়, আপনি নিজেকে বাইরের আরও বড় সময়সীমায় চিন্তা করতে শুরু করলে অসম্ভব শান্তি পেতে পারেন।
এমন কিছু জিনিস আছে যা আপনার চেয়ে অনেক বড়, কিন্তু তার মানে এই না যে আপনি যা করছেন তা গুরুত্বহীন।